আজকের ব্যস্ত জীবনে অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং স্থূলতা আমাদের জীবনে অনেক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরই ফলে বাড়ছে কোলেস্টেরলের মাত্রা। উচ্চ কোলেস্টেরল হৃদরোগ, স্ট্রোকের মতো মারাত্মক রোগের অন্যতম কারণ। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে কোলেস্টেরলকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

কোলেস্টেরল কী?
কোলেস্টেরল হল শরীরের একটি প্রাকৃতিক চর্বি যা কোষের ঝিল্লি তৈরি করতে এবং কিছু হরমোন উৎপাদনে সাহায্য করে। কিন্তু যখন এর মাত্রা বেড়ে যায়, তখন তা রক্তনালীতে জমে রক্ত প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে।
কোন ধরনের কোলেস্টেরল ভাল, কোনটি খারাপ?
- এলডিএল (খারাপ কোলেস্টেরল): এই ধরনের কোলেস্টেরল রক্তনালীতে জমে রোগ সৃষ্টি করে।
- এইচডিএল (ভাল কোলেস্টেরল): এই কোলেস্টেরল শরীর থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সরিয়ে নিয়ে যায়।
কোলেস্টেরল বাড়ার কারণ
- অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
- স্থূলতা
- অভাবনীয় জীবনযাপন
- বংশগত কারণ
কোলেস্টেরল কমানোর উপযোগী খাবার
দ্রবণীয় ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার
দ্রবণীয় ফাইবার LDL কোলেস্টেরল শোষণ কমায়।
- ওটস ও বার্লি: সকালে ওটসের পরিজ বা বার্লির সুজি খান।
- ফল: আপেল, কমলা, পেয়ারা ও নাশপাতি ফাইবারের ভালো উৎস।
- শাকসবজি: গাজর, বেগুন, ঢেঁড়স ও মটরশুঁটি খাদ্যতালিকায় রাখুন।
- বাদাম ও বীজ: চিয়া সিড, ফ্ল্যাক্সসিড সালাদ বা স্মুদিতে মিশিয়ে নিন।
স্বাস্থ্যকর চর্বি
অসম্পৃক্ত চর্বি HDL বাড়ায় ও LDL কমায়।
- অ্যাভোকাডো, জলপাইয়ের তেল: সালাদ বা রান্নায় ব্যবহার করুন।
- বাদাম ও বীজ: আখরোট, কাঠবাদাম, তিল বীজ নিয়মিত খান।
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড
ওমেগা-৩ রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড কমায়।
- মাছ: স্যালমন, ম্যাকেরেল, টুনা সপ্তাহে ২-৩ বার খান।
- উদ্ভিদজাত উৎস: ফ্ল্যাক্সসিড, চিয়া সিড, ওয়ালনাট।
উদ্ভিদ স্টেরল ও স্ট্যানল
এই যৌগগুলি কোলেস্টেরল শোষণে বাধা দেয়।
- ফর্টিফায়েড খাবার: কিছু মার্জারিন, কমলালেবুর জুস।
সয়া প্রোটিন
সয়া LDL কমাতে সাহায্য করে।
- টোফু, সয়া দুধ, এডামামে: মাংসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করুন।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট LDL এর অক্সিডেশন প্রতিরোধ করে।
- বেরি, ডার্ক চকোলেট, গ্রিন টি: প্রতিদিনের ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত করুন।
রসুন ও হলুদ
- রসুন: অ্যালিসিন যৌগ LDL কমায়।
- হলুদ: কারকুমিন প্রদাহ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

সেরা ১০ কোলেস্টেরল কমানোর খাবার
১. ওটস (Oats)
ওটস খুবই জনপ্রিয় এবং স্বাস্থ্যকর একটি খাবার যা কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। ওটসে থাকা বিটা-গ্লুকান নামে এক ধরনের দ্রাব্য আঁশ LDL কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সক্ষম। তাই সকালে প্রাতঃরাশে ওটস খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
প্রস্তুতি: আপনি ওটস দুধ বা জল দিয়ে সেদ্ধ করে খেতে পারেন, অথবা ফল এবং বাদাম মিশিয়ে স্যালাড হিসেবেও খেতে পারেন।
২. শাক-সবজি ও ফলমূল
শাক-সবজি এবং ফলমূলের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে আঁশ এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে, যা রক্তের কোলেস্টেরল কমাতে সহায়ক। বিশেষ করে, সাগ, পালংশাক, টমেটো, গাজর, কপি, ব্রকলি, অ্যাভোকাডো, স্ট্রবেরি, আপেল ইত্যাদি খাদ্যবস্তু কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে।
কীভাবে কাজে আসে? এই খাবারগুলো পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল শোষণ কমিয়ে দেয়।
৩. বাদাম
বাদাম, বিশেষ করে আলমন্ড, ওয়ালনাট এবং পেস্তো কোলেস্টেরল কমানোর জন্য অত্যন্ত কার্যকর। এগুলোর মধ্যে পলিফেনলস এবং অফি-এন-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, যা LDL কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।
কীভাবে খেতে হবে? এক মুঠো বাদাম প্রতিদিন খাওয়ার মাধ্যমে আপনি সহজেই কোলেস্টেরল কমাতে পারবেন। তবে, অতিরিক্ত খাওয়া পরিহার করুন কারণ এতে অতিরিক্ত ক্যালোরি জমতে পারে।
৪. জলপাই তেল (Olive Oil)
জলপাই তেলে থাকে মোনো-অ্যানস্যাচুরেটেড ফ্যাট, যা আমাদের শরীরের “ভাল” কোলেস্টেরল (HDL) বাড়াতে সাহায্য করে এবং “খারাপ” কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে সহায়ক। জলপাই তেলকে আপনি সালাদ ড্রেসিং হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন অথবা রান্নায় ব্যবহার করতে পারেন।
৫. মধু
মধু একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরের টক্সিন বের করে এবং কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে মধু এবং দারচিনি একসাথে খেলে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
ব্যবহার: প্রতিদিন সকালে এক চা চামচ মধু খাওয়া যেতে পারে। এতে শরীরের ভেতর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমতে শুরু করবে।
৬. মটরশুঁটি এবং ডাল
মটরশুঁটি, মুসুর ডাল, চানা ডাল ইত্যাদি প্রোটিন এবং ফাইবারের ভালো উৎস। এগুলো কোলেস্টেরল কমাতে সহায়ক। ডাল এবং মটরশুঁটির মধ্যে উপস্থিত প্রোটিন এবং ফাইবার রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
কীভাবে খেতে হবে? প্রতিদিন ডাল বা মটরশুঁটি আপনার খাদ্যতালিকায় রাখুন। এগুলো স্যুপ, ঝোল বা কাবাব হিসেবেও তৈরি করা যেতে পারে।
৭. মাছ
বিশেষ করে স্যালমন, টুনা, এবং ম্যাকরেল মাছগুলোতে থাকে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এই ধরনের মাছ নিয়মিত খেলে শরীরের ভালো কোলেস্টেরল (HDL) বাড়বে এবং খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমবে।
কীভাবে খেতে হবে? তাজা বা গ্রিলড মাছ খাওয়ার মাধ্যমে আপনি সহজে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের লাভ পেতে পারেন।
৮. সয়াবিন এবং সয়াজাতীয় খাবার
সয়াবিনে থাকা প্লান্ট স্টেরলস এবং অফি-এন-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড কোলেস্টেরল কমাতে সহায়ক। সয়া বা সয়াজাতীয় খাবার শরীরের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে এবং এটি হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
ব্যবহার: সয়া মিল্ক, সয়া পণ্য (যেমন সয়া টোফু, সয়া চিজ ইত্যাদি) খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করুন।
৯. বীজ
বীজগুলোর মধ্যে চিয়া সিডস, ফ্ল্যাকস সিডস, এবং সূর্যমুখী বীজ প্রাকৃতিক ফাইবার এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে ভরপুর। এগুলোর মধ্যে থাকা অফি-এন-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড এবং আঁশ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
কীভাবে খেতে হবে? প্রতিদিন এক চা চামচ চিয়া সিডস বা ফ্ল্যাকস সিডস দিয়ে স্যালাড বা স্যুপে যোগ করতে পারেন।
১০. দারচিনি
দারচিনি একটি প্রাকৃতিক উপাদান যা রক্তে কোলেস্টেরল কমাতে অত্যন্ত কার্যকর। এটি রক্তের শর্করার মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
ব্যবহার: এক চিমটি দারচিনি প্রতিদিন এক কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে খাওয়া যেতে পারে।
কোলেস্টেরল কমাতে কি খাবেন না
কোলেস্টেরল কমাতে সুষম খাদ্য গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কিছু খাবার আছে যা কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে। চলুন জেনে নিই কোন খাবারগুলো এড়িয়ে চলা উচিত:
এড়িয়ে চলার খাবার:
স্যাচুরেটেড ফ্যাট:
গরুর মাংস, খাসির মাংস, বেড়া, চর্বিযুক্ত দুধ, ঘি, মাখন ইত্যাদি।
এই ধরনের ফ্যাট রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) বাড়াতে সাহায্য করে।
ট্রান্স ফ্যাট:
বেকড পণ্য, ফাস্ট ফুড, মার্জারিন, ক্র্যাকার ইত্যাদি।
ট্রান্স ফ্যাট খারাপ কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয় এবং ভাল কোলেস্টেরল (HDL) কমিয়ে দেয়।
কলেস্টেরল সমৃদ্ধ খাবার:
ডিমের কুসুম, অঙ্গরাগ, ঝিনুক ইত্যাদি।
যদিও ডিমের কুসুমে ভালো কোলেস্টেরলও থাকে, তবে অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া উচিত নয়।
প্রক্রিয়াজাত খাবার:
সসেজ, হটডগ, বার্গার, প্রিপ্যাকড খাবার ইত্যাদি।
এই খাবারগুলোতে সাধারণত উচ্চ মাত্রায় সোডিয়াম, চিনি এবং প্রক্রিয়াজাত চর্বি থাকে।
মিষ্টি ও পেস্ট্রি:
কেক, কুকিজ, আইসক্রিম ইত্যাদি।
এই খাবারগুলোতে উচ্চ মাত্রায় চিনি এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বি থাকে।
পানীয় ও শারীরিক পরিশ্রম
- হাইড্রেশন: দিনে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন। হার্বাল টি (গ্রিন টি, হিবiscus চা) উপকারী।
- ব্যায়াম: সপ্তাহে ১৫০ মিনিট হাঁটা, সাইকেল চালানো বা যোগব্যায়াম করুন।
খাদ্য তালিকার নমুনা কোলেস্টেরল
- সকালের নাস্তা: ওটসের পরিজ + আপেল + আখরোট।
- স্ন্যাক্স: গ্রিন টি + কাঠবাদাম।
- দুপুরের খাবার: ব্রাউন রাইস + মাছের ঝোল + সবজি সালাদ।
- বিকালের স্ন্যাক্স: টক দই + বেরি।
- রাতের খাবার: মিসরি ডাল + টোফু ভাজি + পালং শাক।
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন কোলেস্টেরল
- ধূমপান ত্যাগ: ধূমপান HDL কমায় ও ধমনী ক্ষতিগ্রস্ত করে।
- অ্যালকোহল সীমিত করুন: অতিরিক্ত অ্যালকোহল LDL বাড়ায়।
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: মেডিটেশন, প্রাণায়াম চর্চা করুন।
- নিয়মিত চেকআপ: রক্তের কোলেস্টেরল লেভেল মনিটর করুন।
প্রশ্ন ও উত্তর
কোলেস্টেরল কমানোর জন্য কী ধরনের খাবার খাওয়া উচিত?
উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার (যেমন ওটস, শাকসবজি, ফল), চর্বিহীন প্রোটিন (যেমন মাছ, মুরগির বুকের মাংস) এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাট (যেমন বাদাম, অলিভ অয়েল) খাওয়া উচিত।
কোন খাবার কোলেস্টেরল বৃদ্ধি করে?
লাল মাংস, ফাস্ট ফুড, ভাজাপোড়া খাবার, প্রসেসড খাবার, মাখন ও বেশি তেলযুক্ত খাবার কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে।
কোলেস্টেরল কমাতে কোন ফল উপকারী?
আপেল, কমলা, নাশপাতি, বেরি জাতীয় ফল (স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি) ও ডালিম কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে।
কোলেস্টেরল কমানোর জন্য কী ধরনের পানীয় উপকারী?
গ্রিন টি, লেবু পানি, আদা চা ও লো-ফ্যাট দুধ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
ডিম খেলে কি কোলেস্টেরল বেড়ে যায়?
ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল থাকলেও, পরিমিত পরিমাণে (সপ্তাহে ৩-৪টি) খাওয়া ক্ষতিকর নয়। তবে শুধুমাত্র ডিমের সাদা অংশ খাওয়া ভালো।
কোলেস্টেরল কমাতে প্রতিদিন কী পরিমাণ আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত?
প্রতিদিন কমপক্ষে ২৫-৩০ গ্রাম আঁশযুক্ত খাবার (যেমন ওটস, ব্রাউন রাইস, ডাল, শাকসবজি) খাওয়া দরকার।
উপসংহার
কোলেস্টেরল কমানোর জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওটস, শাক-সবজি, বাদাম, মাছ, মধু, সয়া এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবারের মাধ্যমে আপনি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন এবং আপনার হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে পারবেন। তবে, কেবলমাত্র খাদ্যাভ্যাস নয়, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পানি পান এবং মানসিক চাপ কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোও অপরিহার্য, যাতে আপনি আপনার শারীরিক অবস্থার উপর নজর রাখতে পারেন।
এই খাদ্য তালিকাটি অনুসরণ করলে আপনি সহজেই সুস্থ, শক্তিশালী এবং কোলেস্টেরল মুক্ত জীবনযাপন করতে পারবেন।

I am a Rejaul islam dedicated food writer who brings the art of cooking and the joy of dining to life. With expertise in culinary trends, recipes, and cultural food stories, Foods Album delivers engaging content that captivates readers, ignites their taste buds, and celebrates the vibrant world of flavors and traditions.