আমরা সকলেই জানি, প্রোটিন শরীর গঠনের মূল উপাদান। এটি আমাদের পেশি, ত্বক, চুল এবং অন্যান্য অঙ্গের বৃদ্ধি ও মেরামতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও, এটি শরীরের বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শক্তি সরবরাহ করে।
আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের অভাব শরীরের নানা সমস্যার কারণ হতে পারে, যেমন দুর্বলতা, ক্লান্তি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার অভাব, পেশির ক্ষয় ইত্যাদি। তাই প্রোটিনজাতীয় খাবারকে সঠিকভাবে খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই পোস্টে আমরা বাংলাদেশী খাবারের মধ্যে থেকে কিছু প্রোটিনজাতীয় খাবারের তালিকা উপস্থাপন করব।

সেরা ১০ প্রকার প্রোটিন জাতীয় খাবার
প্রোটিন জাতীয় খাবারের মধ্যে অনেক কিছুই আসে, যেমন:
- মাছ – স্যালমন, টুনা, ইলিশ, পাঙ্গাশ
- মাংস – মুরগি, গরু, খাসি, মটন
- ডিম – পুরো ডিম বা শুধু ডিমের সাদা অংশ
- দুধ ও দুধজাত পণ্য – দই, পনির, ঘি
- ডাল – মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা, কাবলি ছোলা
- বাদাম – কাঠ বাদাম, আখরোট, কিশমিশ, পেস্তা
- সয়াবিন – সয়াবিন পণ্য, সয়া মিল্ক
- তিল – তিলের ভাজা, তিলের তেল
- চিকpeas (বুট) – খাওয়া যায় সেদ্ধ বা ভাজি করে
- কুইনোয়া বা চিয়া সিড।
প্রোটিন জাতীয় খাবার কি কি
আপনার দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় প্রোটিন যোগ করার জন্য এখানে কিছু সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর খাবারের তালিকা দেওয়া হল:

1. মাংসজাতীয় খাবার
- মাছ: স্যামন, টুনা, মাক্রেল, সার্ডিন ইত্যাদি।
- মুরগি: হাড়হীন, চামড়াহীন মুরগির স্তন এবং উরু।
- বিফ: লেইন, স্ট্রাইপ লোইন, ফ্লেঙ্ক স্টেক ইত্যাদি।
- টার্কি: হাড়হীন, চামড়াহীন টার্কির স্তন এবং উরু।
2. ডেইরি পণ্য
- দুধ: গরুর দুধ, বাদাম দুধ, সয়াবিন দুধ ইত্যাদি।
- দই: গ্রিক দই, প্লেইন দই ইত্যাদি।
- চিজ: কটেজ চিজ, মোজারেলা চিজ, গ্রুয়ের চিজ ইত্যাদি।
- পনির: প্যানির, চানা ইত্যাদি।
3. ডিম
- সম্পূর্ণ ডিম: ডিমের সাদা এবং কুসুম উভয়ই প্রোটিনে সমৃদ্ধ।
4. শস্যজাতীয় খাবার
- দাল: মসুর ডাল, চনা ডাল, মুগ ডাল ইত্যাদি।
- বীজ: চিয়া বীজ, হেম্প বীজ, ফ্লাক্সসিড ইত্যাদি।
- বাদাম: বাদাম, কাজু বাদাম, আখরোট ইত্যাদি।
- কুইনোয়া: একটি পুষ্টিকর শস্য যা প্রোটিনে সমৃদ্ধ।
5. শাকসবজি
- পালং শাক: ভিটামিন এবং খনিজ লবণের পাশাপাশি প্রোটিনের একটি ভাল উৎস।
- ব্রকলি: ফাইবার এবং প্রোটিনে সমৃদ্ধ।
- মটরশুঁটি: প্রোটিন এবং শর্করা উভয়ই সমৃদ্ধ।
- আলু: প্রোটিনের একটি ভাল উৎস।
6. অন্যান্য
- টোফু: সয়াবিন থেকে তৈরি একটি উদ্ভিজ্জ প্রোটিন।
- টেম্পে: সয়াবিন থেকে তৈরি আরেকটি উদ্ভিজ্জ প্রোটিন।
কোন খাবারে কত প্রোটিন তালিকা
বিভিন্ন খাবারে প্রোটিনের পরিমাণ নিচে উল্লেখ করা হলো, যা গুগল শিটে তৈরি করা যেতে পারে:
খাদ্য | পরিমাণ | প্রোটিন (গ্রাম) |
মুরগির স্তন (skinless) | 100 গ্রাম | 31 |
ডিমের সাদা অংশ | 1টি | 3.6 |
গরুর মাংস (lean) | 100 গ্রাম | 25-30 |
মাছ (বিভিন্ন প্রকার) | 100 গ্রাম | 20-25 |
পনির (Cottage cheese) | 100 গ্রাম | 11 |
দুধ (গরুর) | 1 কাপ | 8 |
দই (Greek yogurt) | 100 গ্রাম | 10 |
মসুর ডাল | 100 গ্রাম | 24 |
কালো মটরশুঁটি | 100 গ্রাম | 21 |
টোফু | 100 গ্রাম | 8 |
কুইনোয়া | 100 গ্রাম | 14 |
বাদাম (বিভিন্ন প্রকার) | 100 গ্রাম | 20-25 |
বীজ (বিভিন্ন প্রকার) | 100 গ্রাম | 20-25 |
প্রোটিনজাতীয় খাবার কেন খাবেন?
প্রোটিন আমাদের শরীরের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি আমাদের পেশি, ত্বক, চুল, এবং অন্যান্য অঙ্গের বৃদ্ধি ও মেরামতের জন্য অপরিহার্য। প্রোটিনজাতীয় খাবার খাওয়ার অনেক উপকারিতা রয়েছে:
পেশি গঠন: প্রোটিন হল পেশির মূল উপাদান। যারা জিম করেন বা শারীরিক পরিশ্রম করেন তাদের জন্য প্রোটিন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি পেশিকে শক্তিশালী করে এবং বৃদ্ধি করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণ: প্রোটিনযুক্ত খাবার খেলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে এবং ক্ষুধা কমে। এটি ওজন কমানোর জন্য সহায়ক।
হাড়ের স্বাস্থ্য: প্রোটিন হাড়কে শক্তিশালী করে এবং অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি কমায়।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রোটিন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
চুল এবং ত্বকের স্বাস্থ্য: প্রোটিন চুল এবং ত্বককে স্বাস্থ্যকর রাখতে সাহায্য করে।
মেটাবলিজম বৃদ্ধি: প্রোটিন শরীরের মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করে, যার ফলে ক্যালোরি দ্রুত পুড়ে যায়।
শক্তি সরবরাহ: প্রোটিন শরীরকে শক্তি সরবরাহ করে এবং দিনভর সক্রিয় থাকতে সাহায্য করে।
প্রোটিনের দৈনিক চাহিদা
বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক পরিশ্রম, এবং স্বাস্থ্য অবস্থা অনুযায়ী প্রোটিনের চাহিদা ভিন্ন হয়। সাধারণভাবে:
- প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ: ৫৬–৬০ গ্রাম/দিন
- প্রাপ্তবয়স্ক নারী: ৪৬–৫০ গ্রাম/দিন
- গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী: ৭১ গ্রাম/দিন
- অ্যাথলেট বা ভারী পরিশ্রম者: ১.২–২ গ্রাম/কেজি (শরীরের ওজন অনুসারে)
প্রোটিন বেশি খেলে কি হয়
প্রোটিন বেশি খেলে কী হয় তা নিয়ে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যায়:
- কিডনির উপর চাপ: বেশি প্রোটিন খাওয়া কিডনির উপর চাপ বাড়াতে পারে, বিশেষ করে যারা ইতিমধ্যে কিডনি সমস্যায় ভুগছে। প্রোটিনের মেটাবলিজমের ফলে কিডনির কাজ বাড়ে, যার ফলে কিডনি ফাংশনে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
- ডিহাইড্রেশন: প্রোটিনের মেটাবলিজমের জন্য শরীরে বেশি পানি প্রয়োজন হয়, ফলে ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
- ওজন বৃদ্ধি: যদি প্রোটিনের সাথে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করা হয়, তবে ওজন বাড়তে পারে। কারণ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনের পরিমাণের বেশি খাওয়ার ফলে অতিরিক্ত ক্যালোরি শরীরে জমতে পারে।
- পাচনতন্ত্রের সমস্যা: বেশি প্রোটিন খাওয়া পাচনতন্ত্রের কাজে বাধা দিতে পারে, যার ফলে কাবস্থতা (constipation), ফুলে যাওয়া (bloating), বা ব্রমহিড্রোসিস (অত্যধিক ব্রম) দেখা দিতে পারে।
- ক্যালসিয়ামের হারানো: বেশি প্রোটিন খাওয়া কিছু ক্ষেত্রে শরীর থেকে ক্যালসিয়ামের হারানো বাড়াতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অস্থি স্বাস্থ্যের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
- হৃদরোগের ঝুঁকি: বিশেষ করে যারা ইতিমধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকিতে আছে, তাদের জন্য বেশি প্রোটিন খাওয়া, বিশেষ করে রেড মিট থেকে, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
প্রোটিনের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সাম্য বজায় রাখা জরুরি। একটি সমতুলিত ডায়েট এবং সুস্থ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে যে পরিমাণ প্রোটিন প্রয়োজন তা বোঝার জন্য নিজের শরীর এবং স্বাস্থ্য অবস্থা বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করা ভালো।
প্রোটিন জাতীয় খাবার খেলে কি হয়
প্রোটিন জাতীয় খাবার খেলে কী হয় তা নির্ভর করে কতটা প্রোটিন খাচ্ছেন, কী ধরনের প্রোটিন এবং আপনার শারীরিক অবস্থা বা স্বাস্থ্যের লক্ষ্যের উপর। এখানে কিছু সাধারণ প্রভাবের তালিকা দেওয়া হল:
ইতিবাচক প্রভাব:
- মাসল গ্রোথ এবং রিকভারি: প্রোটিন মাসল টিস্যুর গঠন এবং পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ব্যায়াম বা কসরতের পর প্রোটিন গ্রহণ শরীরের মেরামত এবং মাসল গ্রোথকে উৎসাহিত করে।
- স্যাচুরিটি বাড়াতে সাহায্য করে: প্রোটিন বেশি খাবার খেলে আপানি দীর্ঘ সময় ধরে পেট ভরা অনুভব করতে পারেন, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
- ইমিউনিটি বাড়াতে সাহায্য করে: প্রোটিন অ্যান্টিবডি গঠন করে, যা শরীরকে রোগ থেকে রক্ষা করে।
- অস্থি স্বাস্থ্য: কিছু প্রোটিন খাবার, যেমন দুগ্ধজাতীয় পণ্য, অস্থি স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম এবং অন্যান্য পোষক তত্ত্ব প্রদান করে।
ঋণাত্মক প্রভাব:
- কিডনি সমস্যা: খুব বেশি প্রোটিন গ্রহণ, বিশেষ করে যারা ইতিমধ্যে কিডনি সমস্যায় আছেন, কিডনির উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
- পাচনতন্ত্রের সমস্যা: বেশি প্রোটিন খেতে পারে কাবস্থতা, ফুলে যাওয়া, বা ঘ্যাম বাড়তে।
- ডিহাইড্রেশন: প্রোটিন মেটাবলিজমের জন্য বেশি পানির প্রয়োজন, যা ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
- ক্যালসিয়ামের হারানো: কিছু গবেষণা দেখায় যে খুব বেশি প্রোটিন গ্রহণ ক্যালসিয়ামের উৎসর্গ বাড়াতে পারে, যা অস্থি স্বাস্থ্যের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
- ওজন বৃদ্ধি: যদি প্রোটিনের সাথে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করা হয়, তবে ওজন বাড়তে পারে, বিশেষত যদি শারীরিক কার্যকলাপ না হয়।
প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ এবং ধরন নির্ধারণ করতে আপনার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য অবস্থা, বয়স, লিঙ্গ, আকার, শারীরিক কার্যকলাপের মাত্রা এবং স্বাস্থ্যের লক্ষ্য বিবেচনা করা উচিত। একজন ডায়েটিশিয়ান বা স্বাস্থ্যকর্মী আপনাকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারেন।
প্রশ্ন – উত্তর
কোন উদ্ভিদজাত খাবারে বেশি প্রোটিন পাওয়া যায়?
সয়াবিন, ছোলা, মসুর ডাল, রাজমা, বাদাম, কুইনোয়া, চিয়া সিড এবং ব্রকলির মতো উদ্ভিদজাত খাবারে প্রচুর প্রোটিন থাকে।
প্রতিদিন শরীরে কতটুকু প্রোটিন দরকার?
একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওজন অনুযায়ী প্রতিদিন প্রতি কেজিতে ০.৮-১ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, ৬০ কেজি ওজনের ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন ৪৮-৬০ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন।
প্রোটিনের অভাবে শরীরে কী সমস্যা হতে পারে?
প্রোটিনের অভাবে পেশি দুর্বল হয়, শরীর দুর্বল লাগে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, চুল ও নখ ভঙ্গুর হয়ে যায় এবং ক্ষত দ্রুত ভালো হয় না।
কোন ফল থেকে প্রোটিন পাওয়া যায়?
আম, কলা, আপেল, খেজুর, ডালিম, গুয়াভা এবং অ্যাভোকাডোতে কিছু পরিমাণ প্রোটিন থাকে, তবে তুলনামূলকভাবে এটি কম।
কোন সবজিতে বেশি প্রোটিন থাকে?
ব্রকলি, পালং শাক, মটর, মাশরুম, সয়াবিন, রাজমা, ছোলা ও মিষ্টি আলুতে ভালো পরিমাণে প্রোটিন রয়েছে।
প্রোটিন কেন দরকার?
প্রোটিন শরীরের কোষ গঠনে সাহায্য করে, পেশির বৃদ্ধি ও শক্তি বাড়ায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করে এবং হরমোন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে।
উপসংহার
আমাদের শরীরের সঠিক বিকাশ এবং স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু মাংস, ডাল, শাকসবজি, বাদাম, দুধজাত খাবার থেকেই আসে না, বরং সঠিকভাবে সুষম খাদ্য গ্রহণ করলে আমরা নানা উৎস থেকে প্রোটিন পেতে পারি। প্রোটিন গ্রহণের মাধ্যমে আমরা শক্তি সঞ্চয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো, মাংসপেশী শক্তিশালী করা এবং শরীরের সঠিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারি। তাই, প্রতিদিন প্রোটিনজাতীয় খাবার গ্রহণ করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
আপনার দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য উপরের খাবারগুলো যুক্ত করতে পারেন। তবে, যে কোনো খাবারই অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া ক্ষতিকর হতে পারে, তাই সঠিক পরিমাণে এবং পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করা উচিত।

I am a Rejaul islam dedicated food writer who brings the art of cooking and the joy of dining to life. With expertise in culinary trends, recipes, and cultural food stories, Foods Album delivers engaging content that captivates readers, ignites their taste buds, and celebrates the vibrant world of flavors and traditions.