আমরা কার্বোহাইড্রেটকেই শর্করা বলি। আমাদের শরীরের প্রধান শক্তির উৎস হল এই শর্করা। আমরা যে সব খাবার খাই, তার বেশিরভাগেই এই শর্করা থাকে। কিন্তু সব শর্করা এক রকম নয়। কিছু শর্করা আমাদের জন্য ভালো, আবার কিছু শর্করা খারাপ।
আজকের এই ব্লগ পোস্টে আমরা শর্করাজাতীয় খাবার সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো। কী ধরনের শর্করা আমাদের জন্য ভালো, কোনগুলো খারাপ এবং কেন, এসব বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।

ভালো শর্করা vs. খারাপ শর্করা
ভালো শর্করা: জটিল শর্করা আমাদের জন্য ভালো। এগুলোতে আঁশ, ভিটামিন এবং খনিজ লবণ থাকে। এগুলো খেলে পেট ভরে থাকে এবং ওজন বাড়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
খারাপ শর্করা: সরল শর্করা আমাদের জন্য খারাপ। এগুলোতে আঁশ, ভিটামিন এবং খনিজ লবণ খুব কম থাকে। এগুলো খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ে এবং ওজন বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
ভালো শর্করা জাতীয় খাবার:
আস্ত শস্য: ভাত, গম, ওটস, জোয়ার, বাজরা ইত্যাদি। এগুলোতে আঁশ, ভিটামিন এবং খনিজ লবণ প্রচুর পরিমাণে থাকে।
দানাশস্য: মটর, মসুর, ছোলা ইত্যাদি। এগুলোতে প্রোটিন এবং আঁশের পাশাপাশি ভালো পরিমাণে শর্করা থাকে।
শাকসবজি: পালং শাক, ব্রোকলি, ফুলকপি, গাজর, আলু ইত্যাদি। এগুলোতে ভিটামিন, খনিজ লবণ এবং আঁশ থাকে।
ফল: আপেল, কলা, কমলা, আম, বেরি ইত্যাদি। এগুলোতে প্রাকৃতিক চিনি, ভিটামিন এবং খনিজ লবণ থাকে।
খারাপ শর্করা জাতীয় খাবার:
প্রক্রিয়াজাত খাবার: বিস্কুট, কেক, চকলেট, সফট ড্রিংকস ইত্যাদি। এগুলোতে অতিরিক্ত চিনি এবং অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান থাকে।
শুদ্ধ চিনি: চা, কফি, মিষ্টিতে ব্যবহৃত চিনি। এগুলোতে শুধু ক্যালোরি থাকে, কোনো পুষ্টিগুণ নেই।
শর্করা কেন প্রয়োজন?
শরীরকে চালু রাখার জন্য শক্তির প্রয়োজন। এই শক্তি আসে শর্করা থেকে। শর্করা আমাদের মস্তিষ্ককেও শক্তি দেয়। এছাড়াও, শর্করা আমাদের পেশীকে কাজ করতে সাহায্য করে।
শর্করার ধরন
শর্করাকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
- সরল শর্করা (Simple Carbohydrates): এই ধরনের শর্করা খুব দ্রুত শরীরে শোষিত হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। ফলের রস, চিনি, মধু ইত্যাদি সরল শর্করার উদাহরণ।
- জটিল শর্করা (Complex Carbohydrates): এই ধরনের শর্করা ভাঙতে বেশি সময় লাগে এবং ধীরে ধীরে শরীরে শক্তি যোগায়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ে। ভাত, রুটি, পাস্তা, শাকসবজি ইত্যাদি জটিল শর্করার উদাহরণ।
সেরা ৭ টি শর্করা জাতীয় খাবার
এখন চলুন, শর্করাজাতীয় খাবারের কিছু জনপ্রিয় ধরন এবং তাদের স্বাস্থ্য উপকারিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি।

১. চাল ও আটা
চাল এবং আটা হলো শর্করাজাতীয় খাবারের অন্যতম প্রধান উৎস। এগুলো জটিল শর্করা হিসেবে পরিচিত, কারণ এগুলিতে ধীরে ধীরে শক্তির উত্পাদন ঘটে এবং দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে শক্তি সরবরাহ করতে থাকে। ভাত (বিশেষত সাদা ভাত) এবং আটার রুটির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে শর্করা থাকে।
- চাল (ভাত): এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান খাবার। সাধারণত, এটি হালকা এবং সহজে হজমযোগ্য, তবে অধিক পরিমাণে খেলে ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে।
- আটা: গমের তৈরি আটা, রুটি এবং পরোটাতে বেশি শর্করা থাকে। এটি শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে এবং দীর্ঘ সময় ক্ষুধা পিপাসা দূর করে।
২. আলু
আলু হলো শর্করা বা ক্যার্বোহাইড্রেটের একটি প্রধান উৎস। এটি সাধারণত স্টার্চে সমৃদ্ধ, যা শরীরে শক্তি সরবরাহে সহায়তা করে। আলু ভাজা, সেদ্ধ, ভাপানো বা রান্না করা যেভাবেই খাওয়া হোক, এর শর্করার পরিমাণ থাকে প্রায় একই। আলুতে ভিটামিন সি, পটাসিয়াম, এবং ফাইবারও থাকে, যা হজম প্রক্রিয়া সহায়ক।
৩. শস্যদানা
শস্যদানা যেমন- গম, বার্লি, ওট, ভুট্টা, তরি ও সয়া বিভিন্ন প্রকার শর্করাজাতীয় খাবারের মধ্যে পড়ে। এগুলো জটিল শর্করা এবং অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান প্রদান করে। গমের রুটি, ওটসের পিঠা, বার্লি খেতে হলে এইসব খাবারকে নিয়মিত খাদ্য তালিকায় রাখা অত্যন্ত উপকারী।
- ওটস: এটি ফাইবারে সমৃদ্ধ যা দীর্ঘ সময় ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
- ভুট্টা: ভুট্টা থেকে তৈরি কর্ন ফ্লেক্স বা ফ্রায়েড ভুট্টা শরীরের শক্তি চাহিদা পূরণে কার্যকরী।
৪. ফলমূল
ফলমূলের মধ্যে শর্করা সাধারণত সহজ শর্করার রূপে পাওয়া যায়, বিশেষ করে ফ্রুকটোজ নামে পরিচিত শর্করা। তবে, অনেক ফলেও জটিল শর্করা পাওয়া যায়। ফলে প্রচুর ভিটামিন, খনিজ, এবং ফাইবারও পাওয়া যায়, যা শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়ক।
- কলা: এতে প্রাকৃতিক শর্করা রয়েছে যা দ্রুত শক্তি প্রদান করে।
- আপেল: আপেলে অনেক শর্করা থাকে এবং এটি শরীরের জন্য খুবই উপকারী।
- আঙ্গুর: সহজ শর্করা হিসেবে আঙ্গুর শরীরকে দ্রুত শক্তি প্রদান করতে সক্ষম।
৫. দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্য
দুধে ল্যাকটোজ নামক একটি প্রাকৃতিক শর্করা থাকে। দুধ এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবারের মধ্যে শর্করা এবং প্রোটিনের সমন্বয় থাকে, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। দই, চিজ, ঘি, মাখন ইত্যাদি দুগ্ধজাত খাবারের মধ্যে শর্করার উপস্থিতি রয়েছে।
৬. মিষ্টি ও পুডিং
মিষ্টি এবং পুডিং জাতীয় খাবারগুলি সাধারণত সহজ শর্করা দিয়ে তৈরি হয়। এই খাবারগুলির মধ্যে সুগার, মধু, চিনি ইত্যাদির প্রাচুর্য থাকে, যা শরীরে তাত্ক্ষণিক শক্তি প্রদান করে। তবে, এসব খাবার বেশি পরিমাণে খাওয়া শরীরের জন্য উপকারী নয়, কারণ এতে অতিরিক্ত ক্যালোরি থাকে।
৭. মধু
মধু একটি প্রাকৃতিক শর্করা উৎস, যা সহজে শরীরে শোষিত হয়। মধুতে গ্লুকোজ, ফ্রুকটোজ এবং কিছু পরিমাণে ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে। এটি শরীরে দ্রুত শক্তি প্রদান করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়।
শর্করাজাতীয় খাবারের স্বাস্থ্য উপকারিতা
- শক্তির উৎস: শর্করাজাতীয় খাবার শরীরে শক্তি সরবরাহ করে। ভাত, রুটি, আলু ইত্যাদি খাবার খেলে শরীর সহজেই শক্তি পায়।
- পেট ভর্তি থাকার অনুভূতি: শর্করাজাতীয় খাবার খেলে ক্ষুধা দমন হয় এবং দীর্ঘ সময় পর্যন্ত পেট ভর্তি থাকার অনুভূতি বজায় থাকে।
- হজমের সুবিধা: জটিল শর্করা যেমন দানাশস্য এবং সবজি শরীরে ধীরে ধীরে শোষিত হয়, ফলে হজমের প্রক্রিয়া সুগম হয়।
- মস্তিষ্কের কার্যক্রম: শর্করা মস্তিষ্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস। এটি মনোযোগ এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে।
শর্করা খাবারের অতিরিক্ত ক্ষতিকর প্রভাব

যদিও শর্করাজাতীয় খাবার শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, অতিরিক্ত শর্করা খাওয়ার ফলে কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বেশী শর্করা গ্রহণ করলে তা শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি সরবরাহ করে, যা অবশেষে মেদ জমা হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়া, অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার ফলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং অন্যান্য রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সঠিকভাবে শর্করা গ্রহণের টিপস
১. জটিল শর্করা বেছে নিন: ব্রাউন রাইস, ওটস, হোল গ্রেইন রুটি।
২. প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন: হোমমেড snacks বানান।
৩. ফলের রসের বদলে গোটা ফল খান: ফাইবার পুষ্টি保留 করে।
৪. লেবেল পড়ুন: “অ্যাডেড সুগার” যুক্ত পণ্য সীমিত করুন।
৫. বাংলা মিষ্টি পরিমিত খান: বিশেষ উপলক্ষ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন।
শর্করাজাতীয় খাবারের বদলে স্বাস্থ্যকর বিকল্প
- সাদা ভাত → কিনোয়া বা বাদামি ভাত।
- সাদা পাউরুটি → মাল্টিগ্রেইন ব্রেড।
- চিনি → মধু বা খেজুরের পেস্ট (পরিমিত)।
প্রশ্ন – উত্তর
শর্করা জাতীয় খাবার কী?
শর্করা জাতীয় খাবার হলো এমন খাবার যা প্রধানত কার্বোহাইড্রেট সরবরাহ করে এবং শরীরের শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।
শর্করা জাতীয় খাবার কি কি?
চাল, গম, রুটি, আলু, মিষ্টি আলু, ভুট্টা, শাকসবজি (যেমন গাজর, বিট), ফলমূল (যেমন কলা, আম, খেজুর), ও বিভিন্ন ধরনের ডাল শর্করা সমৃদ্ধ খাবার।
শর্করার কি ভূমিকা আছে?
শর্করা শরীরের প্রধান শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করে এবং পেশির জন্য জ্বালানি সরবরাহ করে।
কী কী ফল শর্করা জাতীয় খাবারের মধ্যে পড়ে?
কলা, আম, খেজুর, আঙুর, আপেল, আনারস, পেঁপে ও তরমুজ শর্করা সমৃদ্ধ ফল।
অতিরিক্ত শর্করা গ্রহণের ফলে কী সমস্যা হতে পারে?
অতিরিক্ত শর্করা গ্রহণের ফলে ওজন বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, দাঁতের ক্ষয় এবং ইনসুলিন প্রতিরোধের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
কোন শাকসবজিতে বেশি শর্করা থাকে?
আলু, মিষ্টি আলু, গাজর, বিট, ভুট্টা ও কুমড়োতে প্রচুর শর্করা থাকে।
শর্করার প্রধান দুই ধরনের উৎস কী কী?
শর্করার প্রধান দুই ধরনের উৎস হলো সরল শর্করা (যেমন চিনি, মধু, ফল) এবং জটিল শর্করা (যেমন চাল, গম, আলু, ডাল, শাকসবজি)।
উপসংহার
শর্করাজাতীয় খাবার আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় অপরিহার্য। তবে, সব ধরনের শর্করা খাওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক পরিমাণ বজায় রাখা জরুরি। সহজ শর্করা যেমন মিষ্টি ও সোডা, সেগুলি সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত, যাতে শরীরের স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। একদিকে যেমন চাল, আলু, ফলমূল এবং শস্যদানা শরীরকে শক্তি প্রদান করে, তেমনি এই খাবারগুলির সঠিক সমন্বয় এবং পরিমাপ শরীরের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

I am a Rejaul islam dedicated food writer who brings the art of cooking and the joy of dining to life. With expertise in culinary trends, recipes, and cultural food stories, Foods Album delivers engaging content that captivates readers, ignites their taste buds, and celebrates the vibrant world of flavors and traditions.