ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সুষম খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফল, ভিটামিন, খনিজ এবং ফাইবারের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ হলেও, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সব ধরনের ফলই উপযোগী নয়। কারণ, ফলে প্রাকৃতিক শর্করা (ফ্রুক্টোজ) থাকে যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে।

কেন কিছু ফল এড়াতে হয়?

  • গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI): কোনো খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা কত দ্রুত বাড়ায় তা গ্লাইসেমিক ইনডেক্স দিয়ে মাপা হয়। উচ্চ GI বিশিষ্ট ফল রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ক্ষতিকর।
  • শর্করার পরিমাণ: কিছু ফলে শর্করা অন্য ফলের তুলনায় বেশি থাকে। এই ফলগুলি রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়াতে পারে।

এই ব্লগ পোস্টে আমরা আলোচনা করবো কোন ফলগুলি ডায়াবেটিসে এড়িয়ে চলা উচিত এবং কেন।

ডায়াবেটিস হলে কি কি ফল খাওয়া যাবে না

এই ১০ টা ফল খাবেন না ডায়াবেটিস রোগীরা

. আম

আম হলো একটি সুস্বাদু এবং জনপ্রিয় ফল, কিন্তু এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুব বেশি খাওয়ার উপযুক্ত নয়। আমের মধ্যে রয়েছে উচ্চ পরিমাণে ফ্রাক্টোজ এবং গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) যা মোটামুটি ৫১-৫৫। এই গ্লাইসেমিক ইনডেক্স মানটি মাঝারি বলে বিবেচিত হলেও, আমের মধ্যে থাকা শর্করার মাত্রা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বাড়াতে পারে।

  • কেন খাওয়া উচিত নয়: আম খাওয়ার পরে, শরীরে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে পারে যা ইনসুলিনের প্রয়োজনীয়তাকে বাড়িয়ে তোলে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে। বিশেষ করে টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য, আম খাওয়ার পরিমাণ সীমিত রাখা উচিত।
. কলা

কলা হলো আরেকটি ফল যা ডায়াবেটিস রোগীদের খুব বেশি খাওয়া উচিত নয়। কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স মান প্রায় ৪৮-৫০ এর কাছাকাছি, কিন্তু এটি পরিপক্ক হলে এই মান আরো বাড়তে পারে। কলার মধ্যে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট যা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়াতে পারে।

  • কেন খাওয়া উচিত নয়: কলা মিষ্টি এবং কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ, যা গ্লুকোজ মাত্রা দ্রুত বাড়াতে পারে। তবে অপেক্ষাকৃত কম পরিপক্ক কলা (ধরা যাক, সাব্রিজ বা পাকা না হওয়া কলা) খাওয়াতে কিছুটা নিরাপদ হতে পারে কারণ এদের মধ্যে রয়েছে কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স।
. লিচু

লিচু হলো মিষ্টি এবং জলবদ্ধ ফল যা গ্রীষ্মকালে খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু এটির মধ্যে রয়েছে উচ্চ মাত্রার ফ্রাক্টোজ যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

  • কেন খাওয়া উচিত নয়: লিচুর মধ্যে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রাকৃতিক শর্করা, যা রক্তে গ্লুকোজ মাত্রা দ্রুত বাড়াতে সাহায্য করে। এক বা দুইটি লিচু খাওয়াতে সমস্যা হতে পারে না, কিন্তু বেশি খাওয়া লাভজনক নয়।
. পাপাইয়া

পাপাইয়া হলো ভিটামিন এবং মিনারেলস সমৃদ্ধ, কিন্তু এটির মধ্যেও রয়েছে উচ্চ মাত্রার শর্করা এবং মাঝারি গ্লাইসেমিক ইনডেক্স যা প্রায় ৫৮।

  • কেন খাওয়া উচিত নয়: পাপাইয়া খুব বেশি খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়তে পারে। তবে মাঝারি পরিমাণে খাওয়াতে সমস্যা হতে পারে না, কিন্তু বাড়তি পরিমাণ খাওয়ার সময় সাবধান হওয়া উচিত।
. আঙুর

আঙুরের মধ্যে রয়েছে উচ্চ মাত্রার ফ্রাক্টোজ এবং গ্লাইসেমিক ইনডেক্স প্রায় ৫৩। আঙুরের মিষ্টি স্বাদের জন্য এটি খুব আকর্ষণীয়, কিন্তু ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বেশি খাওয়া খুবই খারাপ।

  • কেন খাওয়া উচিত নয়: আঙুর খুব বেশি মাত্রায় খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বাড়তে পারে। এক বা দুইটি আঙুর খাওয়াতে সমস্যা হতে পারে না, কিন্তু একমুঠো আঙুর খাওয়ার মানে রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বাড়তে পারে।

ডায়াবেটিসে এড়িয়ে চলার মতো ফল

. আনারস

আনারসে প্রচুর ফ্রুক্টোজ থাকে। এটি দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে সক্ষম। এর GI মান প্রায় ৫৬।

. তরমুজ

তরমুজ একটি উচ্চ GI মানসম্পন্ন ফল (৭৬)। যদিও এতে পানির পরিমাণ বেশি, কিন্তু শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়।

. চেরি

মিষ্টি চেরি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এতে উচ্চমাত্রায় শর্করা রয়েছে, যা রক্তের শর্করার মাত্রা বাড়ায়।

. ডুমুর

ডুমুর বা ফিগস মিষ্টি ফল এবং এতে প্রচুর ফ্রুক্টোজ রয়েছে। এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

১০. সফেদা

সফেদা মিষ্টি এবং এতে প্রচুর চিনি থাকে। এটি ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে।

ডায়াবেটিসে ফল খাওয়ার সঠিক পদ্ধতি

যদিও উপরে উল্লেখিত ফলগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তবুও কিছু পরামিতি মেনে চললে ডায়াবেটিস রোগীরাও নিরাপদে ফল উপভোগ করতে পারেন।

. ছোট অংশে খাওয়া

ফল খাওয়ার সময় পরিমাণ কম রাখুন। ছোট অংশে খেলে রক্তের শর্করার উপর প্রভাব কম পড়ে।

. কম GI ফল বেছে নিন

আপেল, বেরি, কমলা, নাশপাতি, পেঁপে, এবং স্ট্রবেরির মতো ফল কম GI মানসম্পন্ন এবং ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিরাপদ।

. তাজা ফল বেছে নিন

কোনো প্রক্রিয়াজাত ফল (যেমন ক্যানড ফল) বা ফলের রস এড়িয়ে চলুন। এগুলোতে প্রাকৃতিক শর্করার ঘনত্ব বেশি থাকে।

. প্রোটিনের সাথে খাওয়া

ফল খাওয়ার সময় প্রোটিনযুক্ত খাবারের সাথে মিশিয়ে খেলে শর্করার মাত্রা ধীরে বৃদ্ধি পায়।

সামগ্রিক সতর্কতা:

যদিও এই ফলগুলো ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খুব বেশি খাওয়ার উপযুক্ত নয়, তা বলে এগুলো সম্পূর্ণ ভাবে বর্জন করা উচিত নয়৷ মাঝারি পরিমাণে এই ফলগুলো খেয়েও লাভ হতে পারে, কিন্তু খাওয়ার পরিমাণ এবং সময়কালের উপর খুব ভালো নজর রাখতে হবে।

তথ্যসূত্র পরামর্শ: ডায়াবেটিস ম্যানেজমেন্টের জন্য, ডায়াবেটোলজিস্ট বা পুষ্টির বিশেষজ্ঞের সাথে কথোপকথন করা এবং ব্যক্তিগত খাদ্য তালিকায় সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন উত্তর

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কোন ফলগুলো ক্ষতিকর?

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) এবং চিনি সমৃদ্ধ ফল ক্ষতিকর। যেমন – আম, কাঁঠাল, আঙুর, লিচু, কলা, এবং খেজুর।

ডায়াবেটিস হলে কি আম খাওয়া যাবে?

আম মিষ্টি এবং উচ্চ মাত্রার প্রাকৃতিক চিনি (ফ্রুক্টোজ) ধারণ করে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি করতে পারে। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের বেশি পরিমাণে আম খাওয়া এড়ানো উচিত।

কাঁঠাল কি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপযোগী?

কাঁঠালে প্রচুর প্রাকৃতিক চিনি থাকে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এটি খাওয়া সীমিত রাখা বা একেবারে এড়িয়ে যাওয়া ভালো।

আঙুর কি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ক্ষতিকর?

হ্যাঁ, আঙুরে উচ্চ পরিমাণে চিনি থাকে, যা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের এটি পরিহার করা উচিত।

খেজুর কি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভালো?

খেজুর উচ্চ ক্যালোরি এবং চিনি সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপযুক্ত নয়। এটি দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।

ডায়াবেটিস রোগীদের কি সম্পূর্ণভাবে ফল খাওয়া বন্ধ করতে হবে?

না, ডায়াবেটিস রোগীদের সম্পূর্ণভাবে ফল এড়ানোর দরকার নেই। তবে কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত ফল যেমন – আপেল, নাশপাতি, জাম, বেরি, এবং কমলা পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।

উপসংহার

ডায়াবেটিসে ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে সচেতন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত এবং চিনিযুক্ত ফল এড়িয়ে চলা উচিত। সঠিক ফল বেছে নিয়ে এবং নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে খাওয়ার মাধ্যমে ডায়াবেটিস রোগীরাও একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে পারেন। আপনার ডায়েট পরিকল্পনার জন্য অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নিন।


Similar Posts