ক্যালসিয়াম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান যা আমাদের শরীরের হাড় ও দাঁত শক্তিশালী রাখতে সহায়ক। এটি আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বিশেষ করে স্নায়ু সংক্রমণ, পেশীর সংকোচন এবং রক্তের সংকোচন নিয়ন্ত্রণে।
ক্যালসিয়াম সঠিক পরিমাণে গ্রহণ না করলে হাড়ের দুর্বলতা, অস্থি ক্ষয় (অস্টিওপোরোসিস) এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তাই, দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
এখন আসুন, ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তালিকা দেখে নিই, যা আপনাদের শরীরকে সুস্থ রাখবে।

সেরা ৯ প্রকার ক্যালসিয়াম যুক্ত খাবারের তালিকা
১. দুধ
দুধ ক্যালসিয়ামের প্রধান উৎস হিসেবে পরিচিত। এক গ্লাস দুধে প্রায় ৩০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে, যা একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দৈনিক ক্যালসিয়াম চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করতে সক্ষম। এর পাশাপাশি, দই, পনির, ঘি, মাখন ইত্যাদি দুধজাত পণ্যগুলোও ক্যালসিয়ামে সমৃদ্ধ।
- পনির: পনির বিশেষ করে চীজ ক্যালসিয়ামের একটি ভালো উৎস। এটি সারা দিনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়ামের একটি বড় অংশ প্রদান করতে পারে।
- দই: দইও ক্যালসিয়ামের একটি ভাল উৎস এবং এটি অন্ত্রের জন্যও উপকারী।
২. সবজি
সবজি ক্যালসিয়ামের জন্য একটি দুর্দান্ত উৎস হতে পারে, বিশেষ করে পাতালকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, পালং শাক, মেথি ইত্যাদি।
- বাঁধাকপি: বাঁধাকপি সেরা ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ সবজির মধ্যে অন্যতম। এটি সহজেই রান্না করা যায় এবং শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
- পালং শাক: পালং শাকের মধ্যে ভিটামিন, খনিজ, এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের সমৃদ্ধ সংমিশ্রণ থাকে যা শরীরের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
- ব্রকলি: ব্রকলি অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ একটি সবজি। এটি রান্না করে বা স্যালাডের মতো কাঁচাও খাওয়া যেতে পারে।
৩. মাছ
মাছ ক্যালসিয়ামের একটি দুর্দান্ত উৎস, বিশেষ করে স্যামন, সারডিন, টুনা, এবং হেরিং। ছোট মাছ যেমন সারডিন, খাওয়ার সময় তার হাড়গুলোও খাওয়া যেতে পারে, যা ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ।
- স্যামন: স্যামন একধরণের তেলযুক্ত মাছ, যা ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও সরবরাহ করে।
- স্যারডিন: স্যারডিন মাছের হাড়গুলো খাওয়া হয়, এবং সেই হাড়ে প্রচুর ক্যালসিয়াম থাকে।
৪. বাদাম
বাদাম ও বীজও ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে আখরোট, কেশু, বাদাম, সেমি (চিয়া সিড), তিল, সানফ্লাওয়ার সিড ইত্যাদি।
- তিল: তিলের মধ্যে প্রচুর ক্যালসিয়াম রয়েছে। বিশেষ করে তিলের লাডু বা তিল খিচুড়ি প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম সরবরাহ করতে পারে।
- বাদাম: কাঠবাদাম এবং পিস্তাচিওতে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ।
৫. ফল
ফলের মধ্যে এমন কিছু রয়েছে যা ক্যালসিয়ামের সাথে অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও সরবরাহ করে। যেমন: কমলা, আমলকি, কিউই, আনারস ইত্যাদি।
- কমলা: কমলা কেবল ভিটামিন সি’ই নয়, এতে কিছু পরিমাণ ক্যালসিয়ামও রয়েছে যা হাড়ের জন্য উপকারী।
- আমলকি: আমলকি ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি, এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ যা শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।
৬. শস্য
শস্যজাত খাবার যেমন ওটস, বাদামজাত মুড়ি, সয়াবিন, চিঁড়ে ইত্যাদিও ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস।
- ওটস: ওটসে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ ভালো এবং এটি বিভিন্ন ধরনের পুষ্টির সঙ্গে শরীরে শক্তি যোগ করতে সাহায্য করে।
- সয়াবিন: সয়াবিন, ত্বক সহ অন্য অনেক প্রকারের সয়া পণ্য ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস।
৭. মিষ্টান্ন
ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ কিছু নিরামিষ মিষ্টান্ন যেমন ক্যালসিয়াম-অধিক সয়া মিল্ক বা তাজা মিষ্টান্নের বিভিন্ন ধরনের রেসিপি ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
৮. পানীয়
কিছু পানীয় যেমন ক্যালসিয়াম-ফোর্টিফাইড জুস বা সয়া মিল্ক, যেগুলো ক্যালসিয়ামের উৎস হতে পারে। বিশেষ করে সয়া মিল্ক এবং ক্যালসিয়ামযুক্ত অ্যালমন্ড মিল্ক খুবই জনপ্রিয় এবং স্বাস্থ্যকর বিকল্প।
৯. সূপ
অনেক সূপও ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস হতে পারে। বিশেষ করে হাড়ের সূপ বা মাংসের সূপে প্রাকৃতিক ক্যালসিয়াম থাকে। এগুলো হাড় ও শরীরের অন্যান্য কোষের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
কোন কোন ফলে ক্যালসিয়াম বেশি আছে

যদিও ফল ক্যালসিয়ামের খুব বড় উৎস নয়, কিছু ফলে তুলনামূলকভাবে বেশি ক্যালসিয়াম থাকে। এখানে কিছু ফল এবং তাদের ক্যালসিয়াম পরিমাণ উল্লেখ করা হলো:
- শুকনো ডুমুর (Dry Figs): শুকনো ডুমুর ক্যালসিয়ামের একটি ভালো উৎস। প্রায় 5টি শুকনো ডুমুরে প্রায় 90mg ক্যালসিয়াম থাকে।
- কিশমিশ (Raisins): কিশমিশেও কিছু পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে। প্রায় 1/4 কাপ কিশমিশে প্রায় 30mg ক্যালসিয়াম থাকে।
- কমলা (Orange): একটি মাঝারি আকারের কমলায় প্রায় 60mg ক্যালসিয়াম থাকে।
- কিউই (Kiwi): একটি মাঝারি আকারের কিউইতে প্রায় 30mg ক্যালসিয়াম থাকে।
- অ্যাপ্রিকট (Apricot): শুকনো অ্যাপ্রিকটেও কিছু পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে। প্রায় 1/4 কাপ শুকনো অ্যাপ্রিকটে প্রায় 20mg ক্যালসিয়াম থাকে।
এটা মনে রাখা দরকার যে, ফল ক্যালসিয়ামের প্রধান উৎস নয়। ক্যালসিয়ামের জন্য আপনাকে অন্যান্য খাবার যেমন দুধ, দই, পনির, শাকসবজি এবং বাদামের উপর নির্ভর করতে হবে।
ক্যালসিয়াম যুক্ত সবজি
ক্যালসিয়ামের জন্য ভালো সবজি গুলো হলো:
- পালং শাক (Spinach): পালং শাকে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ মোটামুটি বেশি।
- ব্রককলি (Broccoli): ব্রককলি ক্যালসিয়ামের একটি ভাল উৎস।
- কলার্ড গ্রিনস (Collard Greens): এই শাকে ক্যালসিয়ামের মাত্রা খুবই বেশি।
- কেল (Kale): কেলেও ক্যালসিয়ামের ভাল উৎস।
- মুলা শাক (Turnip Greens): মুলার শাকেও ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।
- বোক চয় (Bok Choy): এটি মাঝারি পরিমাণে ক্যালসিয়াম ধারণ করে।
- মুস্তার্ড গ্রিনস (Mustard Greens): মুস্তার্ড শাকেও ক্যালসিয়াম প্রাপ্ত হয়।
এই সবজিগুলো আপনার খাবারে যোগ করে আপনি ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন মেটাতে পারেন।
ক্যালসিয়ামের দৈনিক চাহিদা
বয়স ও লিঙ্গভেদে ক্যালসিয়ামের চাহিদা ভিন্ন:
- শিশু (১-৩ বছর): ৭০০ মিলিগ্রাম
- বাচ্চা (৪-৮ বছর): ১০০০ মিলিগ্রাম
- কিশোর-কিশোরী (৯-১৮ বছর): ১৩০০ মিলিগ্রাম
- প্রাপ্তবয়স্ক (১৯-৫০ বছর): ১০০০ মিলিগ্রাম
- বয়স্ক (৫০+ বছর) ও গর্ভবতী নারী: ১২০০ মিলিগ্রাম
ক্যালসিয়াম শোষণ বাড়ানোর টিপস
ক্যালসিয়াম গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন:
- ভিটামিন ডি: ভিটামিন ডি ক্যালসিয়ামের শোষণে সাহায্য করে। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি গ্রহণ করাও জরুরি।
- পরিমিত গ্রহণ: অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ করলে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই প্রতিদিনের চাহিদা অনুযায়ী ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা উচিত।
- খাদ্য তালিকা: আপনার খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন ধরনের ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করুন।
বাংলাদেশী খাবারে ক্যালসিয়াম যোগ করার উপায়
- সকালের নাস্তায়: দই বা পনির সাথে ফল মিশিয়ে খান।
- মাছের ঝোল: কাঁটাসহ ছোট মাছ দিয়ে ঝোল রান্না করুন।
- শাকের ভাজি: বিভিন্ন শাক মিশিয়ে ভেজিটেবল কারি বা ভাজি বানান।
- লাচ্ছা বা স্মুদি: দুধ বা সয়া মিল্কে তিল/চিয়া সিড মিশিয়ে পান করুন।
ক্যালসিয়াম অভাবে কি হয়
- হাড়ের দুর্বলতা বা ফ্র্যাকচার হওয়া সহজ
- দাঁতে সমস্যা দেখা দেয়
- মাংসপেশীতে টান বা ব্যথা
- স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা (যেমন অবসন্নতা, ঝিম ঝিম ভাব)
- হৃদযন্ত্রে সমস্যা (হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক হওয়া)
প্রশ্ন – উত্তর
ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার কোনগুলো?
দুধ, দই, পনির, ছোট মাছ (যেমন কাঁচকি, মলা), কালো তিল, বাদাম, শাক-সবজি (যেমন পালং শাক, কলমি শাক) ইত্যাদি ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার।
দুধ ছাড়া ক্যালসিয়াম পাওয়ার ভালো উৎস কী?
দুধ ছাড়া ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস হলো ছোট মাছ (কাঁটাসহ), বাদাম (বিশেষ করে আমন্ড), শাক-সবজি (যেমন পালং শাক, ব্রকলি), তিল, ছোলা, সয়াবিন ও কালো বিউলি ডাল।
ক্যালসিয়াম গ্রহণের জন্য দিনে কতটুকু খাবার খাওয়া উচিত?
একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির প্রতিদিন প্রায় ১০০০-১২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। এটি পূরণ করতে প্রতিদিন এক গ্লাস দুধ, এক বাটি দই, কিছু বাদাম ও সবুজ শাকসবজি খাওয়া যেতে পারে।
ক্যালসিয়ামের অভাব হলে শরীরে কী সমস্যা হয়?
ক্যালসিয়ামের অভাবে হাড় দুর্বল হয়ে যায়, দাঁতের সমস্যা হয়, পেশির খিঁচুনি হতে পারে, এবং দীর্ঘমেয়াদে অস্টিওপরোসিস (হাড় ক্ষয়) রোগ হতে পারে।
কি কি শাক-সবজিতে বেশি ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়?
পালং শাক, কলমি শাক, ব্রকলি, বাঁধাকপি, মিষ্টি আলু, বিট শাক এবং ফুলকপিতে প্রচুর ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়।
উপসংহার
ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত গ্রহণ করে আপনি হাড়ের ক্ষয়রোধ, পেশীর শক্তি বৃদ্ধি ও সার্বিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে পারেন। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় দুগ্ধজাত খাবার, শাকসবজি, মাছ ও বীজ অন্তর্ভুক্ত করে সহজেই ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করুন। সুস্থ থাকুন, সক্রিয় থাকুন!

I am a Rejaul islam dedicated food writer who brings the art of cooking and the joy of dining to life. With expertise in culinary trends, recipes, and cultural food stories, Foods Album delivers engaging content that captivates readers, ignites their taste buds, and celebrates the vibrant world of flavors and traditions.