আমাশয় একটি সাধারণ কিন্তু অস্বস্তিকর অসুখ যা আমাদের অন্ত্রকে প্রভাবিত করে। এই রোগে আক্রান্ত হলে পাতলা পায়খানা, পেটে ব্যথা, জ্বর ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। এই সময় সঠিক খাবার খাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমাশয়ের কারণে শরীর পানি ও লবণের অভাব বোধ করে এবং সঠিক খাবারের মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা জরুরি।
আমরা জানি, আমাশয় হলে খাবারের উপর কিছু নিষেধাজ্ঞা থাকে। তবে এই নিষেধাজ্ঞার মাঝেও আমরা আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য পুষ্টিকর খাবার খেতে পারি। আজকের এই ব্লগ পোস্টে আমরা আমাশয় রোগীদের জন্য কিছু সুষম খাবার তালিকা এবং খাওয়ার বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেব।

১০ পদের আমাশয় রোগের খাবার
১. পানির গুরুত্ব
আমাশয় আক্রান্ত রোগীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল পানি। ডায়রিয়া বা আমাশয় হলে শরীর দ্রুত পানি ও সোডিয়াম হারিয়ে ফেলে, যার ফলে ডিহাইড্রেশন হতে পারে। এজন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা খুবই জরুরি। পাশাপাশি, স্যালাইন সলিউশন বা অরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন (ORS) পান করা শরীরের জলের ভারসাম্য ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
২. হালকা ও সহজপাচ্য খাবার
আমাশয়রোগীকে হালকা ও সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ করা উচিত। অত্যধিক মসলাযুক্ত, তেলযুক্ত বা ভারী খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। প্রাথমিক অবস্থায় কিছু সহজ খাবার যেমন:
- খিচুড়ি (সাদা চাল ও মুসুর ডালের খিচুড়ি)
- সেদ্ধ আলু
- পটল বা লাউ
- সেদ্ধ পেঁয়াজ ও গাজর
- সাদা ব্রেড বা সাদা রুটি
- দই (অথবা, প্রোবায়োটিক খাবার)
এই ধরনের খাবার হজমে সহায়ক এবং অন্ত্রের পক্ষে কম চাপ তৈরি করে।
৩. প্রোবায়োটিক খাবার
আমাশয়রোগীদের জন্য প্রোবায়োটিক খাবার অত্যন্ত উপকারী। প্রোবায়োটিক্স অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করে এবং পেটের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। তাই, দই, ছাতু, লস্যি, কিমচি, ইত্যাদি প্রোবায়োটিক খাবার খাওয়া উচিত।
৪. সেদ্ধ বা স্টিম করা খাবার
আমাশয় রোগীদের জন্য সেদ্ধ বা স্টিম করা খাবার গ্রহণ করা উচিত, কারণ এতে প্রচুর পুষ্টি থাকে এবং এটি পেটের উপর কম চাপ ফেলে। সেদ্ধ সবজি, সেদ্ধ ডিম বা সেদ্ধ মাছ খাওয়া পেটের জন্য নিরাপদ এবং উপকারী।
৫. ফাইবারযুক্ত খাবার
যদিও আমাশয়ের সময় অতিরিক্ত ফাইবারযুক্ত খাবার গ্রহণ অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে, তবে একদম সহজপাচ্য এবং হালকা ফাইবার গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধ কলা বা সিদ্ধ আপেল খুবই উপকারী হতে পারে, কারণ এতে সহজ হজমযোগ্য ফাইবার থাকে, যা অন্ত্রের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
৬. শর্করা ও প্রোটিন
আমাশয় আক্রান্ত রোগীদের জন্য শর্করা ও প্রোটিনের সঠিক পরিমাণে সরবরাহ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শর্করা যেমন চাল, সাদা রুটি এবং মিষ্টি আলু, রোগীকে শক্তি প্রদান করে, আর প্রোটিন যেমন মুরগির মাংস, মুসুর ডাল বা মাছ পেটের গঠন এবং পুনরুদ্ধারে সহায়ক।
৭. মিষ্টি খাবার এড়িয়ে চলুন
মিষ্টি খাবার যেমন কেক, চকলেট বা মিষ্টির মধ্যে প্রচুর চিনি থাকে, যা অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাড়িয়ে দিতে পারে এবং ডায়রিয়ার অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। তাই আমাশয়রোগীকে মিষ্টি বা চিনিযুক্ত খাবার থেকে দূরে থাকতে হবে।
৮. আমাশয়রোগীদের খাবারের নিয়ম
আমাশয়রোগীকে খাবারের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম পালন করতে হবে:
- খাবার ছোট পরিসরে, বার বার খাওয়া – বড় বড় পরিমাণে খাবার না খেয়ে, ছোট ছোট পরিসরে খাবার গ্রহণ করতে হবে।
- তাজা, পরিষ্কার খাবার গ্রহণ করুন – খাবারের সর্বোচ্চ সতেজতা এবং পরিষ্কারতার দিকে নজর দিন।
- ভোজনের পরে বিশ্রাম – খাবার খাওয়ার পর খুব বেশি পরিশ্রম বা হাঁটা চলা করা উচিত নয়।
৯, ১০. কফি, চা বা প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন
এছাড়া কফি, চা, কোল্ড ড্রিঙ্কস, এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পানীয় এড়ানো উচিত, কারণ এগুলি পেটের সমস্যা বাড়াতে পারে এবং ডিহাইড্রেশন বাড়াতে পারে।

আমাশয় হলে কেন সঠিক খাবার খাওয়া জরূরি?
আমাশয়ের সময় সঠিক খাবার খাওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ:
- পানিশূন্যতা রোধ: আমাশয়ের কারণে পাতলা পায়খানা হওয়ায় শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। ফলে শরীর পানিশূন্যতায় ভুগতে পারে। সঠিক খাবারের মাধ্যমে এই পানিশূন্যতা দূর করা যায়।
- অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত: সঠিক খাবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে এবং পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে।
- শরীরে শক্তি যোগান: আমাশয়ের সময় শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। পুষ্টিকর খাবার শরীরে শক্তি যোগান দেয় এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠতে সাহায্য করে।
আমাশয় রোগীদের জন্য খাওয়ার বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
- তরল খাবার: আমাশয়ের সময় প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খাওয়া জরুরি। এতে পানি, নারকেল পানি, চালের পানি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।
- সহজে হজমযোগ্য খাবার: আমাশয়ের সময় সহজে হজমযোগ্য খাবার খাওয়া উচিত। যেমন: চালের পানি, চালের সুজি, মুড়ি, ওটমিল ইত্যাদি।
- ফাইবারযুক্ত খাবার: ফাইবারযুক্ত খাবার অন্ত্রের জন্য ভাল না। তাই আমাশয়ের সময় ফাইবারযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।
- মশলাযুক্ত খাবার: মশলাযুক্ত খাবার অন্ত্রকে উত্তেজিত করতে পারে। তাই আমাশয়ের সময় মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।
- তেলাতৈলী খাবার: তেলাতৈলী খাবার হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই আমাশয়ের সময় তেলাতৈলী খাবার এড়িয়ে চলা উচিত।
- দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার: কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার আমাশয়কে আরও খারাপ করে তুলতে পারে। তাই এই ধরনের খাবার খাওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- ফল: আপেল, পেয়ারা, কেলা ইত্যাদি ফল আমাশয়ের সময় খাওয়া যেতে পারে। তবে ফল খাওয়ার আগে ভাল করে ধুয়ে নিতে হবে।

আমাশয় হলে কি খাবার খাওয়া যাবে
১. মসলাযুক্ত ও তেলেভাজা খাবার
বিরিয়ানি, তেহারি, ফাস্ট ফুড বা চিপস অন্ত্রের জ্বালা বাড়ায় এবং হজমে সমস্যা সৃষ্টি করে।
২. ক্যাফেইন ও কার্বনেটেড ড্রিংকস
চা, কফি, সফট ড্রিংকস ডিহাইড্রেশন বাড়ায় এবং পেটে গ্যাস তৈরি করে।
৩. কাঁচা শাকসবজি ও ফল
সালাদ, কাঁচা পেঁপে, বা আঁশযুক্ত সবজি হজম হতে কষ্ট হয়। রান্না করে খাওয়া নিরাপদ।
৪. দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য
ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা দেখা দিলে দুধ, পনির বা মিষ্টি এড়ানো ভালো।
৫. মাংস ও ডাল
গুরুপাক প্রোটিন যেমন রেড মিট, মসুর ডাল হজমে চাপ সৃষ্টি করে। সুস্থ হওয়ার পর ধীরে ধীরে খাবেন।
আমাশয় রোগীর জন্য স্যাম্পল ডায়েট চার্ট
সকাল ৭ টা:
- ওরস্যালাইন (১ গ্লাস)
- চিড়া ভিজানো (অল্প নুন ও কলা দিয়ে)
সকাল ১০ টা:
- ডাবের পানি + সিদ্ধ আলু
দুপুর ১ টা:
- মুগ ডালের খিচুড়ি (হলুদ ছাড়া)
- সিদ্ধ মিষ্টিকুমড়া
বিকাল ৪ টা:
- ভাতের মাড় + টোস্ট
সন্ধ্যা ৭ টা:
- গাজর-আলুর স্যুপ
- কলা
রাত ৯ টা:
- হালকা গরম পানিতে মধু
অতিরিক্ত সতর্কতা
- হাত ধোয়া: খাওয়ার আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।
- পরিষ্কার পানি: ফুটানো বা ফিল্টার্ড পানি পান করুন।
- খাবার গরম করে খান: বাসি খাবার এড়িয়ে চলুন।
- ঔষধ: ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিপ্যারাসিটিক ওষুধ সেবন করুন।
আমাশয় রোগের ঘরোয়া চিকিৎসা
- তোকমার পানি: ১ চামচ তোকমা গুড়ো করে পানিতে ভিজিয়ে খান। এতে ফাইবার ও প্রোবায়োটিক্স থাকে।
- আদা-মধু: আদার রস ও মধু মিশিয়ে খেলে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপকার পাবেন।
- গুড়-জিরা: কাঁচা জিরা ভেজে গুড়ের সঙ্গে মিশিয়ে খান। এটি পেটের গ্যাস কমায়।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
- ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তীব্র ডায়রিয়া বা রক্তপাত হলে।
- জ্বর ১০১°F এর বেশি হলে বা শরীরে পানিশূন্যতার লক্ষণ (চোখ ঢুকে যাওয়া, প্রস্রাব কম) দেখা দিলে।
- শিশু, গর্ভবতী বা বয়স্কদের ক্ষেত্রে অবহেলা করবেন না।
প্রশ্ন ও উত্তর
আমাশয় হলে কী ধরনের খাবার খাওয়া উচিত?
হালকা ও সহজপাচ্য খাবার, যেমন খিচুড়ি, সেদ্ধ ডাল, সাদা ভাত ও সেদ্ধ সবজি খাওয়া ভালো।
আমাশয় হলে কোন খাবার এড়িয়ে চলা উচিত?
মসলা ও তেলযুক্ত খাবার, দুগ্ধজাত খাবার, ফাস্ট ফুড, এবং কাঁচা শাকসবজি পরিহার করা উচিত।
আমাশয় রোগীর জন্য সেরা পানীয় কী?
ডাবের পানি, গ্লুকোজ মিশ্রিত পানি, ওরস্যালাইন ও ফুটানো পানি পান করা ভালো।
আমাশয় হলে ফল খাওয়া যাবে কি?
কলা ও পাকা পেঁপে খাওয়া ভালো, তবে টক ফল ও বেশি আঁশযুক্ত ফল এড়িয়ে চলা উচিত।
আমাশয় হলে কী ধরনের স্যুপ খাওয়া উচিত?
মুরগির স্যুপ, সবজি স্যুপ, ও গাজর-ডালের স্যুপ খাওয়া উপকারী।
উপসংহার
আমাশয় রোগীর খাদ্যতালিকা হতে হবে সহজপাচ্য, পুষ্টিকর ও নিরাপদ। এই সময়ে ভারী খাবার, মসলা বা ক্যাফেইন এড়িয়ে চললে দ্রুত সুস্থতা আসে। পাশাপাশি বিশ্রাম ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলুন। মনে রাখবেন, সঠিক ডায়েটই রোগ প্রতিরোধের প্রথম ধাপ।

I am a Rejaul islam dedicated food writer who brings the art of cooking and the joy of dining to life. With expertise in culinary trends, recipes, and cultural food stories, Foods Album delivers engaging content that captivates readers, ignites their taste buds, and celebrates the vibrant world of flavors and traditions.